মুসলিম জনগোষ্ঠীর ব্রিটিশ বিরোধী সংগ্রামের উজ্জ্বল অধ্যায়ের সূচনা হয় ফকির সন্ন্যাসী বিদ্রোহ ১৭৬০-১৮০০। সময়মত খাজনা দিতে না পারায় জমি থেকে উৎখাতকৃত কৃষকেরা তাদের সাথে যোগ দিয়ে সন্ন্যাসী বিদ্রোহকে গণবিদ্রোহের রুপদান করেছিলেন। ইংরেজ কর্তৃপক্ষ ফকির সম্প্রদায়কে ডাকাত আখ্যায়িত করে তাদের সংগ্রামকে দমিয়ে দেয়। এই আন্দোলন প্রশমণ হওয়ার পূর্বেই সৈয়দ আহমদের নেতৃত্বে উত্তর পশ্চিম ভারতে দুর্নিবার ধর্মভিত্তিক ওয়াহাবি আন্দোলন শুরু হলে ইংরেজদের বেকাদায় পড়তে হয়। তাই ইংরেজরা কৌশল অবলম্বন করে মুসলমানদের সাথে শিখদের সংঘর্ষ বাঁধিয়ে দেয়। এতে করে এই আন্দোলন ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। ওয়াহাবি আন্দোলনের পরপরই আরম্ভ হয় তিতুমীরের নেতৃত্বে মুসলিম সাধারণ সমাজ বিশেষ করে রায়তের অধিকার আদায়ের আন্দোলন ১৮৩০-৩২। মক্কায় তিতুমীর হজ্ব করতে গেলে সেখানে তিনি সৈয়দ আহমদের সংস্পর্শে আসেন। উত্তর চব্বিশ পরগনায় অবস্থিত নারকেল বেড়িয়ায় তিতুমীরের বাঁশের কেল্লা নামে একটি দেশীয় দুর্গ নির্মাণ করেই ইংরেজদের আক্রমণ প্রতিরোধ করেছিলো। শেষ পর্যন্ত তিতুমীর নিহত হলে তাদের দলের প্রতিরোধ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। প্রায় একই সময়ে আরম্ভ হয়েছিল দক্ষিণ-মধ্য বঙ্গে ফরায়েজি আন্দোলন। এই আন্দোলনও ব্রিটিশ বিরোধী সংগ্রামের রূপ পরিগ্রহ করেছিলো। হাজী শরিয়ত উল্লাহ এই আন্দোলনের নেতৃত্ব দিতে গিয়ে মৃত্যুবরণ করলে তার পুত্র দুদু মিঞা পরবর্তীতে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।
১৭৯৩ সালে কর্নওয়ালিস প্রবর্তিত চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের কুফল ছিলো চাষিদের নিকট ভয়ংকর। জমিদারদের অন্যায় কর আদায়ের ব্যাপারে জমিদারদের পূর্ণ ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছিলো। বাংলার জমিদারদের অধিকাংশই ছিল হিন্দু আর চাষি বা রায়তদারের অধিকাংশই ছিল মুসলমান, যে কারণে সাম্প্রদায়িকতার মনোভাব দেখা দেয়। ইংরেজ দ্বারা সৃষ্ট চিরস্থায়ী বন্দোবস্তই এই বাংলায় সাম্প্রদায়িকতার বীজ রোপণ করেছিল তা অস্বীকার করা যায় না।
ব্রিটিশ আধিপত্য বিস্তারের বিরুদ্ধে সর্বশেষে এবং সর্বাপেক্ষা রক্তক্ষয়ী প্রয়াস ছিল সিপাহি বিদ্রোহ ১৮৫৭। উত্তর ভারতের প্রায় সমস্ত বড় বড় শহরে এই বিদ্রোহ সংঘটিত হয়। বিদ্রোহের লক্ষ্য ছিল শ্রেতাঙ্গরা। সিপাহি বিদ্রোহ অনেকটা আকস্মিক ছিল, ভারতের বিশাল জনগোষ্ঠীর এই বিদ্রোহে অংশ গ্রহণের সুযোগ ছিল না। এই সীমাবদ্ধতা যদি না থাকতো, তবে নিঃসন্দেহে এর ফলাফল অন্যরূপ হতো।
সিপাহি বিদ্রোহের ১৮ বছর পর বাংলার মুসলিম সমাজের জাগরণের ইতিহাসে যে সকল কীর্তিমান ব্যক্তিত্বের জন্ম হয়েছিলো, তন্মধ্যে অন্যতম ছিলেন- মৌলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী। ১৮৭৫ সালে চন্দনাইশ সাবেক পটিয়া থানার আডালিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ১৮৯৩ সালে তিনি হুগলি, মাদ্রাসা থেকে টাইটেল পাস করেন। ১৮৯৮ সালে তিনি বৃটিশ বিরোধী সংগ্রামে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে কয়েকটি সংগঠন মুসলিম সমাজে এক পরিবর্তনের সূচনা করে। এই সংগঠন সমূহ ছিল মো েম কনফারেন্স, ইসলাম মিশন, মো েম শিক্ষা সমিতি। ১৯০২ সালে কিংবা এর নিকটবর্তী সময় বিশিষ্ট স্বাধীনতা সংগ্রামী মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী এই সংগঠন সমূহের প্রতিষ্ঠাতাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন। কংগ্রেসের আহবানে স্বদেশী আন্দোলন শুরু হলে মুসলিম জাতীয়তাবাদী শক্তি এই আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন। মৌলানা জামাল উদ্দিন আফগানী প্রচারিত প্যান ইসলামিক আন্দোলন প্রগতিশীল মুসলিম সমাজে জাতীয় চেতনার সৃষ্টি করে। এই চেতনাকে ভিত্তি করেই মুসলিম জাতীয়তাবোধের সৃষ্টি হয়। পরবর্তীতে সামগ্রিক অর্থে বাঙালি জাতীয়তাবোধের দৃঢ় ভিত্তি রচনা হয় মুসলিম সমাজে তখন থেকে।
Post a Comment