সত্য বার্তা পত্রিকা লিখে ছিলোণ্ড কর্মবীর মাওলানা সাহেব ১৯০৬ সালের বঙ্গভঙ্গ রহিত আন্দোলনে যোগ দিয়া উক্ত সাপ্তাহিক ছোলতানে আন্দোলনের বহু প্রবন্ধ ও ব্যক্তিগত মন্তব্য প্রকাশ করেন। সরকার প্রবর্তিত ভার্নাকুলার প্রেস আইনের কারণে নির্ভীক কোন রচনা প্রকাশ করা যেত না। এতদসত্ত্বেও জনমত সংগঠনে ‘ছোলতান’ পত্রিকার ভূমিকা ছিল প্রশংসনীয়। উপমহাদেশে মুসলিম সমাজ তুরস্কে খলিফার পক্ষ নিয়ে অসহযোগ ও খিলাফত আন্দোলন শুরু করার পরিকল্পনায় মৌলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী ছিলেন প্রধান সংগঠকদের মধ্যে অন্যতম। ১৯২০ সালের প্রথম দিকে বঙ্গীয় প্রাদেশিক খিলাফত কমিটি গঠিত হয়। সভাপতি ছিলেন-মৌলানা আবুল কালাম আজাদ, সহসভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন মৌলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী। চট্টগ্রাম জেলা কমিটির সভাপতি ছিলেন শেখ-এ-চাট্গাম কাজেম আলী মাস্টার। ১৯২০ সালের ৩ মার্চ ঢাকার আহসান মঞ্জিলের খেলাফত কনফারেন্সে মৌলানা ইসলামাবাদী বলেছিলেন পাশ্চাত্যের দেশসমূহের ষড়যন্ত্রের ফলে তুরস্কের স্বাধীনতা লোপ পেলে এশিয়ার অন্যান্য মুসলিম দেশসমূহের স্বাধীনতাও বিপন্ন হয়ে পড়বে। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামও অর্থহীন হয়ে পড়বে। এ বছরেই তিনি চট্টগ্রামের জে. এম. সেন হলের খিলাফত জনসভায় সভাপতিত্ব করেছিলেন।
মৌলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী মনে করতেন খিলাফত ও অসহযোগ উভয়েই অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। একটিকে ছাড়া অন্যটি দিয়ে লক্ষ অর্জন সম্ভব হবে না। আর আল ইসলাম পত্রিকায় একটি প্রবন্ধে তিনি লিখেছিলেন- “খেলাফত লইয়া আজ এছলাম জগৎ যুদ্ধ ও বিচলিত, কিন্তু প্রতিকারের উপায় একমাত্র অসহযোগিতা। এই অসহযোগ আন্দোলনের উদ্দেশ্যে দুইটি (১) খেলাফত সমস্যার সমাধান, তুরস্কের সোলতান-এর হৃতরাজ্য সমূহের পুনরুদ্ধার। এছলাম জগতের খলিফার পদমর্যাদা রক্ষা করা (২) ভারতে স্বরাজ লাভ”। আল এছলাম পত্রিকায় খিলাফত শীর্ষক আর এক প্রবন্ধে মুসলিম সমাজের উদ্দেশ্যে তিনি লিখেছিলেন “এছলাম রক্ষা করিতে হইলে-মোছলমান নামে অভিহিত হইতে হইলে, শেষ প্রেরিত মহাপুরুষ হযরত মোহাম্মদের উম্মতের মধ্যে গণ্য হইয়া থাকিতে হইলে, খলিফাকে রক্ষা করা, খলিফার রাজ্য, তাহার ক্ষমতা ও পদমর্যাদা রক্ষা করা প্রত্যেক মোছলমানের ফরজ।” খিলাফত আন্দোলনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল মুসলিম আন্দোলনকারীরা হিন্দু আন্দোলনকারীদের সাথে একতাবদ্ধ হয়ে বিদেশি শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন পরিচালনা করা। প্রকৃতপক্ষে উভয় সম্প্রদায়ের লক্ষ্য ছিল অভিন্ন। ড. অমলেশ ত্রিপাটি এ বিষয়ের উপর বলেছিলেন-জামাল উদ্দীন আফগানি ইসলাম ও ইহুদীদের মৈত্রীর উপর জোর দিয়েছিলেন, তেমনি মৌলানা আজাদ, মৌলানা মোহাম্মদ আলী, শওকত আলী, মৌলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী হিন্দু মুসলিম মৈত্রীর উপর। ত্রিপাটি আরও লিখেছিলেন, মৌলানা মুহাম্মদ আলীরা মনে করতেন, ভারত স্বাধীন হলে তুরস্কের স্বাধীনতা আনতে সাহায্য করবে।
স্বাধীনতা সংগ্রামকে মৌলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী ধর্মীয় কর্তব্য বলে মনে করতেন “কুরআন স্বাধীনতাকে কত উচ্চে স্থান দিয়েছেন এবং কাপুরুষতা ও পরাধীনতাকে কিরূপ ঘৃণিত পদার্থ ও অভিশপ্ত বস্তু রূপে ব্যাখ্যা করিয়াছে, তাহা সুষ্ঠুভাবে চিন্তা করিয়া দেখিলে রাজনৈতিক জগতেও স্বাধীনতার ইতিহাসে ইহা এক অমূল্য সম্পত্তি বলিয়া নির্দিষ্ট হইবে।” মৌলানা ইসলামাবাদী “পরাধীনতাকে আল্লাহর অভিসম্পাত বলে মনে করেন”। তিনি লিখেছে যে, “স্বাধীনতা আল্লাহর দান ও পরাধীনতাকে আল্লাহর কঠিন আজাব ও গজব বলিয়া কুরআন পুনঃ পুনঃ ঘোষণা করিয়াছেন। সেই অভিশাপ হইতে উদ্ধার চাওয়ার চেষ্টা করা কি অনিবার্য কর্তব্য নহে? এই কর্তব্য পালনে শৈথিল্য করিলে যে তজ্জন্য শুধু পরকালে নহে, ইহকালেও আল্লাহর গজবে পড়িতে হয়”।
মৌলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদীরা ব্রিটিশ বিরোধী সংগ্রামে মুসলিম জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের মাধ্যমে বাঙালি জাতীয়তাবোধের দৃঢ় ভিত্তি রচনা করেছিলেন। মৌলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী ৭৫ বছর বয়সে ২৪ অক্টোবর ১৯৫০ সালে ইন্তেকাল করেন।
ভারতীয় জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের প্রথম সূত্রপাত করেন কিছু শিক্ষিত বাঙালি বুদ্ধিজীবী, যাঁদের পুরোধা ছিলেন চিত্তরঞ্জন দাস, সত্যেন্দ্রনাথ বন্দোপাধ্যায় ইত্যাদি নরমপন্থীরা, এবং পরবর্তীতে বিপ্লবাত্মক ভূমিকায় ঋষি অরবিন্দ ঘোষ, নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু, রাসবিহারী বসু, ক্ষুদিরাম বসু, প্রফুল্ল চাকী, সূর্য সেন প্রমুখ বীর বিপ্লবীবর্গ।[তথ্যসূত্র প্রয়োজন]
বঙ্গভঙ্গসম্পাদনা
বঙ্গভঙ্গ ইতিহাসে ঘটে দুবার: ১৯০৫ সালে ব্রিটিশ রাজত্বকালে বঙ্গভঙ্গ, যাতে উদবেলিত বাঙালির প্রবল প্রতিবাদস্বরূপ বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন হলে ১৯১১ সালে এই বঙ্গভঙ্গ রদ হয়। দ্বিতীয়বার বাংলা ভাগ হয় ১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীন হবার সময়— বাংলার মুসলিমপ্রধান পূর্ব ভাগ পুর্ব পাকিস্তান হিসাবেপাকিস্তানের অংশগত হয় ও হিন্দু প্রধান পশ্চিম ভাগ পশ্চিমবঙ্গ নামে ভারতের অংশ থাকে। পুর্ব পাকিস্তান এক রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের পর হয় অধুনা স্বাধীন বাংলাদেশ।
Post a Comment