ইতিহাসসম্পাদনা।
বাঙালি জাতির ইতিহাসকে আদি বা প্রাচীন, মধ্যযুগ ও আধুনিক যুগে ভাগ করা যায়।
প্রাচীন ইতিহাসসম্পাদনা।
আগে এদেশের সভ্যতাকে অনেকেই অর্বাচিন বলে মনে করলেও বঙ্গদেশে চার হাজারেরো বেশি প্রাচীন তাম্রাশ্ম (chalcolithik) যুগের সভ্যতার নির্দশন পাওয়া গেছে, যেখানে দ্রাবিড়, তিব্বতী-বর্মী ও অস্ট্রো-এশীয় নরসম্প্রদায়ের বাস ছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে। বঙ্গ বা বাংলা শব্দটির সঠিক বুৎপত্তি জানা নেই তবে অনেকে মনে করেন এই নামটি এসে থাকতে পারে দ্রাবিড় ভাষী বং নামক একটি গোষ্ঠী থেকে যারা এই অঞ্চলে আনুমানিক ১০০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে বসবাস করত।ডঃ অতুল সুরের মতে "বয়াংসি" অর্থাৎ পক্ষী এদের টোটেম ছিল। আর্যদের আগমনের পর বাংলা ও বিহার অঞ্চল জুড়ে মগধ রাজ্য সংগঠিত হয় খ্রীশষ্টপূর্ব সপ্তম শতকে। বুদ্ধেরসময় মগধ ছিল ভারত উপমহাদেশের চারটি মহাশক্তিশালী রজত্বের অন্যতম ও ষোড়শ মহাজনপদের একটি। বংশের চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যেররাজত্বের সময় মগধের বিস্তার হয় দক্ষিণ এশিয়ার এক বিশাল অঞ্চলে। খ্রীষ্টপূর্ব তৃতীয় শতকে সম্রাট অশোকের সময় আফগানিস্তানও পারস্যের কিছু অংশও মগধের অধিকারভুক্ত ছিল। বৈদেশিক রচনায় বাংলার প্রথম উল্লেখ দেখা যায় গ্রিকদের লেখায় ১০০ খ্রীষ্টপূর্বাব্দের কাছাকাছি। তাতে বর্ণিত আছে গাঙ্গেয় সমতলভুমিতে বাসকারী গঙ্গাঋদ্ধি নামে জাতির শৌর্যবীর্যের কথা যা শুনে মহাবীরআলেক্সান্ডার তাঁর বিশ্ববিজয় অসম্পূর্ণ রেখে বিপাশার পশ্চিম তীর থেকেই প্রত্যাবর্তন করেছিলেন। গঙ্গারিডি শব্দটি হয়ত গ্রিক Gangahrd (গঙ্গাহৃৎ) থেকে এসে থাকবে— গঙ্গা-হৃৎ অর্থাৎ গঙ্গা হৃদয়ে যে ভুমির।[১৪]খ্রীষ্টীয় তৃতীয় শতকে মগধে গুপ্ত রাজবংশের পত্তন হয়।
মধ্যযুগসম্পাদনা
বাংলার প্রথম স্বাধীন রাজা বলা হয় শশাঙ্ককেযার রাজত্ব ছিল সাতশো শতকের গোড়ার দিকে।তারপর কিছুদিন অরাজকতার পরবৌদ্ধধর্মাবলম্বী পাল বংশ এখানে চারশো বছর রাজত্ব করে, তারপর অপেক্ষাকৃত কম সময় রাজত্ব করে ব্রাহ্মণ্য হিন্দু ধর্মী সেন বংশ। বাংলা অঞ্চলে প্রথম ইসলামের প্রচার হয় দ্বাদশ শতকে সুফী ধর্মপ্রচারকদের দ্বারা। পরবর্তীতে বাংলা ইসলামীয় রাজত্বের অধিকারভুক্ত হলে বাংলায় প্রায় সব অঞ্চলেই দ্রুত ইসলামের প্রসার ঘটে।দিল্লীর দাস বংশের সুলতানীর একজন তুর্কী সেনাপতিবখতিয়ার খলজী সেন বংশের রাজা লক্ষ্মণ সেনকে পরাজিত করে বাংলার এক বিশাল অংশ দখল করেন। অতঃপর দিল্লীর বিভিন্ন সুলতান রাজবংশ ও বা তাদের অধীনস্থ স্থানীয় সামন্ত রাজারা বাংলায় রজত্ব করে। চতুৃর্দশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে বাংলার স্বাধীন সুলতানী আমলের সুচনা হয় যা দুই শতাব্দীরও বেশি সময় স্থায়ী হয়েছিল । ষোড়শ শতকে মুঘল সেনাপতি ইসলাম খানবাংলা দখল করেন। কিন্তু ধীরে ধীরে দিল্লীর মুঘল সরকারের নিযুক্ত শাসকদের হাত ছাড়িয়ে আপাত-স্বাধীন মুর্শিদাবাদেরনবাবদের রাজত্ব শুরু হয়, যারা দিল্লীর মুঘল সরকারের শাসন কেবল নামে মাত্র মানত।
বাংলার নবজাগরণসম্পাদনা
বাংলার নবজাগরণ বলতে বোঝায় ব্রিটিশ রাজত্বের সময় অবিভক্ত ভারতের বাংলাঅঞ্চলে ঊনবিংশ ও বিংশ শতকে সমাজ সংস্কার আন্দলনের জোয়ার ও বহু কৃতি মনীষীর আবির্ভাবকে। মুলতঃ রাজারামমোহন রায়ের(১৭৭৫-১৮৩৩) সময় এই নব জাগরণের শুরু এবং এর শেষ ধরা হয় কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের (১৮৬১-১৯৪১) সময়ে, যদিও এর পরেও বহু জ্ঞানীগুণী মানুষ এই সৃজনশীলতা ও শিক্ষাদীক্ষার জোয়ারের বিভিন্ন ধারার ধারক ও বাহক হিসাবে পরিচিত হয়েছেন।ঊনবিংশ শতকের বাংলা ছিল সমাজ সংস্কার, ধর্মীয় দর্শনচিন্তা, সাহিত্য, সাংবাদিকতা, দেশপ্রেম, ও বিজ্ঞানের পথিকৃৎদের এক অন্যন্য সমাহার যা মধ্যয্যগের যুগান্ত ঘটিয়ে এদেশে আধুনিক যুগের সূচনা করে।[১৮]
স্বাধীনতা আন্দোলনসম্পাদনা
বাঙালিরা ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে খুবই মূল্যবান ভূমিকা পালন করে। বাঙ্গালি মুসলমানরা সর্বপ্রথম ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের সচূনা করে। ১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধে নবাব সিরাজদৌল্লার পরাজয়ের ফলে শাসন ক্ষমতা যে এদেশীয়দের কাছ থেকে বিদেশিদের হাতে চলে গিয়েছিল, এটা বুঝতে এখানকার জনগণের বেশ সময় লেগেছিল। ১৭৬০ খৃস্টাব্দে চট্টগ্রামের এবং ১৭৬৫ খৃস্টাব্দে বাংলার দেওয়ানি লাভের সাথে শাসন ক্ষমতাও তারা কুক্ষিগত করতে অগ্রসর হয়। পলাশীর যুদ্ধের পর এই রাজনৈতিক পট পরিবর্তন জনমনে বিশেষ রেখাপাত করেনি।
দেরিতে হলেও এদেশীয়রা ইংরেজদের অভিসন্ধি যখন বুঝতে পারলো, তখনই তারা রাজস্ব দিতে অস্বীকৃতি জানায়। ইংরেজদের দেওয়ানি রাজস্ব দিতে প্রথম অস্বীকৃতি জানায় পার্বত্য চট্টগ্রামের চাকমা জনগোষ্ঠী। ১৭৭২ সাল থেকে ১৭৯৮ সাল পর্যন্ত তারা ইংরেজদের বিরুদ্ধে সংঘর্ষে লিপ্ত থাকে। অবশেষে ইংরেজরা তাদের সেনাবাহিনী দিয়ে প্রতিরোধ করে। তারপর দুর্জন সিংহের নেতৃত্বে চেয়ার বিদ্রোহ হয় ১৭৯৯ সালে, তাও সেনাবাহিনীর সাহায্যে দমন করা হয়।
Post a Comment